স্বৈরাচার হাসিনার পলায়ন
ইতিহাস বদলে দেওয়া ৫ আগস্ট: গণ-অভ্যুত্থান ও নতুন বাংলাদেশের সূচনা

- আপডেট সময় : ০৩:৫০:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫ ৩৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট এক স্মরণীয় দিন, যা গণ-অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের এই দিনে দেশের ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় নেয়। দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পরিবর্তনের ঢেউ।
আন্দোলনের সূচনা: কোটা সংস্কার থেকে জাতীয় বিপ্লব
সবকিছু শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ জুলাই। সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে। আন্দোলন প্রথমে ছিল শান্তিপূর্ণ, কিন্তু দ্রুত তা বেগবান হতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গুলি চালানো, গণগ্রেপ্তার ও দলীয় ক্যাডারদের সহিংস হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্রমজীবী মানুষ, তরুণ-তরুণী, পেশাজীবী, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরাও এই আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ দেশের প্রায় প্রতিটি শহরে ছড়িয়ে পড়ে এই গণআন্দোলন।
গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তর
দাবি ছিল একটি—সরকারের পদত্যাগ। ৫ আগস্ট ছিল সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত দিন। সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ রাজধানীর দিকে অগ্রসর হয়। পুলিশের বাধা, কারফিউ, এবং ইন্টারনেট বন্ধ করেও মানুষকে থামানো যায়নি।
বিকেল নাগাদ লাখো মানুষ রাজধানীর পথে নেমে আসে। কারফিউ উপেক্ষা করে গণভবন অভিমুখে মানুষের ঢল নামে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তাল হয়ে ওঠে যে, শেষমেশ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে রাতের আঁধারে দেশত্যাগ করেন।
স্বৈরাচারের পতন ও নতুন দিগন্ত
শেখ হাসিনার বিদায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছরের একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটে। তাঁর নেতৃত্বে ২০০৯ সাল থেকে টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের শাসন ব্যবস্থা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, বাকস্বাধীনতার দমন, দুর্নীতি ও দমন-পীড়ন সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষের আগুন জ্বালিয়ে তোলে।
তাঁর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ৬ আগস্ট দুপুরে বঙ্গভবন থেকে এক বিবৃতিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং ছাত্রনেতাদের বৈঠকের সিদ্ধান্তে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
একতরফা নির্বাচনের পরিণতি
এর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল একতরফা। অধিকাংশ বিরোধী দল সেই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে শাসক দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং সরকার গঠন করে। কিন্তু মাত্র ছয় মাসেই সেই সংসদ বিলুপ্ত হয়।
এ ঘটনা ইতিহাসে বিরল—একটি সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই জনতার চাপ ও গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়। ৫ আগস্ট তাই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিবর্তনের প্রতীক।
সরকার স্বীকৃত দিবস ঘোষণা
পরবর্তী সরকার ৫ আগস্টকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দিনটি স্মরণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিশেষ বাণী প্রদান করেন। একইসাথে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ঘোষণা পাঠ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
পরিণতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
এই গণ-অভ্যুত্থান শুধুই একটি সরকারের পতন নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অবদমন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিবাদ। দেশজুড়ে নতুন আশা, নতুন নেতৃত্ব, এবং একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে।
৫ আগস্ট তাই শুধু একটি তারিখ নয়—এটি একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়, একটি মুক্তির দিন, যেখানে জনগণের ইচ্ছা চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছে।